সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি: যেভাবে উত্তর করবে

ক্লাস ফোরে পড়ার সময় প্রথম সৃজনশীল ব্যাপারটার নাম শুনি। তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে নতুন এক পদ্ধতি প্রয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়, যা-ই মূলত এই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি। সেই শুরুর দিকে সৃজনশীল বলতে বুঝতাম, একটি প্রশ্নের ৪টি অংশ থাকবে, প্রতি নম্বরের জন্য একটি লাইন লিখতে হবে, এক নাম্বারের জন্য এক লাইন কিংবা চার নাম্বারের জন্য চার লাইন। ক্লাস সিক্সে উঠার পর জীবনে প্রথম পূর্ণরূপ সৃজনশীল পদ্ধতির সাথে পরিচিত হই। সত্যি বলতে, খুবই জঘন্য ছিল সেই অভিজ্ঞতা। জীবনে প্রথমবার সেবার সময়ের অভাবে প্রায় ৮ নম্বর খালি রেখে আসতে হয়েছিলো। সেইদিনই মনে হয়েছিলো “এই সৃজনশীল ব্যাপারটাকে মোটেও হালকা করে নেয়া যাবেনা।”

        তোমরা যারা স্কুল-কলেজে পড়াশুনা করছো, তোমরাই ভালো জানো সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির এ-টু-জেড। আজকাল তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় ৭টা সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর লিখতে পারা-না পারা নিয়ে হাজারো ট্রলও বের হচ্ছে। এটা সত্য যে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কলম চালিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর। কিন্তু অন্য আরেকটি সত্য হচ্ছে, একটু কৌশল অবলম্বন করলেই কিন্তু এই কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়ে যাবে। আর তার জন্য জানতে হবে সঠিক নিয়মে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর করার নিয়ম। চলো, জেনে আসা যাক-

সৃজনশীল প্রশ্নের স্তর

প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্নের ৪টি স্তর থাকে। স্তরগুলো হচ্ছে জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগমূলক ও উচ্চতর দক্ষতামূলক। সাধারণ গণিত বা উচ্চতর গণিতের সৃজনশীল পদ্ধতিতে আবার ৪টির স্থলে ৩টি প্রশ্নস্তর থাকে- অনুধাবনমূলক, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতামূলক। প্রতিটি প্রশ্নের সাথেই একটি অনুচ্ছেদ দেয়া থাকে। বাংলা, ইসলাম শিক্ষা কিংবা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের মত বিষয়গুলোতে সাধারণত অনুচ্ছেদের সাথে তুলনাস্বরূপ বিভিন্ন প্রশ্ন দেয়া থাকে। কিন্তু গণিতের ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বেশীরভাগ সময়ই গণিতে অনুচ্ছেদের তথ্য ব্যবহার করে প্রশ্নের উত্তর করতে হয়।

সৃজনশীল প্রশ্নোত্তরের নিয়মাবলি

সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার কিছু নিয়মাবলি রয়েছে। কেবল পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখলেই নম্বর পাওয়া যায়, এমনটা ভেবে থাকলে তা নিঃসন্দেহে ভুল। ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে লেখা শেষ করার পরও হয়তো দেখা যাবে, পাশের সারির ছেলেটা তোমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি নম্বর পেয়েছে। তবে এমনটা হওয়ার কারণ কী? কারণটা হচ্ছে, অনেকের কাছেই সৃজনশীল প্রশ্নোত্তরের সঠিক নিয়মটা আমাদের অনেকের কাছেই অজানা। খাতার সৌন্দর্য রক্ষা, বাক্যগঠনে তত্ত্বভিত্তিক তথ্য উপাস্থাপন, প্রশ্নোত্তরে স্বচ্ছতা থাকা বাঞ্ছনীয়, সৃজনশীলের ক্ষেত্রে উদ্দীপক ও পাঠ্য বইয়ের সমন্বয় সাধন ইত্যাদির সমন্বয়েই সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর করতে হয়।

        একটি সৃজনশীল প্রশ্নের ৪টি অংশের উত্তরের জন্যও ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি নিয়ম রয়েছে কিন্তু। এসব নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে যেন সম্পূর্ণ সৃজনশীল লিখতে ২০-২২ মিনিটের বেশি না লাগে। ২০ মিনিটের মধ্যেই এক একটি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লিখে ফেললেই দেখবে যে পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ লেখা সম্পন্ন হয়ে যাবে। সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার পদ্ধতি ও সময়বন্টনের বিষয়গুলো জেনে আসি, চলো-

জ্ঞানমূলক প্রশ্নোত্তর

এই অংশের প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে ছোট হবে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, এই অংশের প্রশ্নের উত্তর এক লাইনের মধ্যেই শেষ করে দেয়া শ্রেয়। অনেকে জ্ঞানমূলক প্রশ্নের উত্তর এক শব্দে লিখে থাকে। এই পদ্ধতি ভুল না হলেও অনেক শিক্ষকই এক শব্দে উত্তর লিখতে বারণ করে থাকেন। জ্ঞানমূলক প্রশ্ন সাধারণত বই থেকেই আসে। এই অংশের প্রশ্নের সাথে উদ্দীপকের অনুচ্ছেদের মিল থাকেনা বলেই ধরে নেয়া যায়।

সময়- ১ মিনিট

অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর

        এই অংশে কখনও কখনও বই থেকে প্রশ্ন দেয়, আবার কখনও কখনও উদ্দীপক হতেও প্রশ্ন আসতে পারে। অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর করতে হবে দুটি অংশে, কেননা এই প্রশ্নের নম্বর বণ্টনও হচ্ছে ২। উত্তরের ২টি অংশ প্যারা আকারে লিখতে হবে। প্যারার প্রথম অংশে প্রশ্নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু জ্ঞানমূলক উত্তর দেয়া যেতে পারে। পরবর্তী অংশে প্রশ্নের মূল উত্তর কিছুটা গুছিয়ে লিখতে হবে।

  প্রথম প্যারায় জ্ঞানের অংশ অল্প কথায় শেষ করেই দ্রুত দ্বিতীয় অংশে নজর দিতে হবে। ৬-৭ লাইনের মধ্যে পুরো প্রশ্নের উত্তর অনুধাবনের ধাঁচে লিখে শেষ করতে হবে। অনুধাবন প্রশ্নের উত্তরের সাইজ আধ পৃষ্ঠা হলে ভালো হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বেশি সুন্দর করে লিখতে গিয়ে যেনো অতিরিক্ত সময় খরচ না হয়।

সময়- ৪/৫ মিনিট

প্রয়োগমূলক প্রশ্নোত্তর

        প্রয়োগমূলক প্রশ্নোত্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই প্রশ্নের উত্তরের সাহায্যেই পুরো সৃজনশীল প্রশ্নোত্তরের একটি ধারণা পাওয়া যায়। পুরো সৃজনশীল প্রশ্নকে যদি একটি মানবদেহের সাথে তুলনা করা হয়, তবে প্রয়োগমূলক প্রশ্নের ভূমিকা অনেকটা মূলদেহের মত। জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনে সাধারণত বইয়ের জ্ঞানের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়া হলেও প্রয়োগমূলক প্রশ্নের মাধ্যমেই উদ্দীপকের সাথে পাঠ্যবই ও তার সাথে প্রশ্নের একটা যোগসূত্র ঘটানো হয়।

        এই অংশে মূলত উদ্দীপকের কোনো অনুচ্ছেদের সাথে পাঠ্যবইয়ের কোনো অংশের পার্থক্য কিংবা সাদৃশ্য তুলে ধরতে বলা হয়। এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য নির্ধারিত নম্বর হচ্ছে ৩। সুতরাং এই প্রশ্ন ৩ প্যারায় দিলে সবচেয়ে ভালো হয়। প্রথম প্যারায় থাকবে যথারীতি কিছু জ্ঞানের সমাহার। এক্ষেত্রে প্রথম প্যারায় উদ্দীপকের অনুচ্ছেদের ছোট একটি সারমর্ম দেয়া যেতে পারে এবং একইসাথে অনুচ্ছেদের সাথে পাঠ্যবইয়ের গল্প-কবিতার সম্পর্কটাও খুব ছোট আকারে দেয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় প্যারায় মূলভাব লিখতে হবে। এই অংশে কখনোই উদ্দীপকের বিষয়বস্তু সরাসরি তুলে আনা উচিত না, কারণ এই জিনিসটা প্রথম প্যারার মধ্যেই সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখিত রয়েছে। দ্বিতীয় প্যারায় একদম স্পষ্টভাবে প্রশ্নে যা চাওয়া হয়েছে সেইদিকে ফোকাস করতে হবে। ৭-৮ লাইনের মধ্যে উদ্দীপকের সাথে বইয়ের পঠিত বিষয়ের অংশের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য তুলে ধরতে হবে। শেষ প্যারা হবে কিছুটা বাংলা রচনার উপসংহারের মত। এই অংশেই মূলত প্রয়োগের ব্যাপারটা চলে আসবে। এখানে উত্তরের পুরো অংশের একটা ছোট “প্রিভিউ” দিতে হবে এবং সাথে সাথে উদ্দীপকের সাথে গদ্যাংশ-পদ্যাংশের পার্থক্যটাও লিখতে হবে। প্রয়োগমূলক প্রশ্নের উত্তর সর্বোচ্চ দেড় পৃষ্ঠার মধ্যে সম্পন্ন করাটাই যুক্তিযুক্ত। এর বেশি অহেতুক কথাবার্তা লিখলে তা প্রচুর সময় নষ্ট করবে।

সময়- ৬/৭ মিনিট

উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্নোত্তর

        বলে রাখা ভালো, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্নের উত্তরে সম্পূর্ণ নম্বর পাওয়া একটু কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এই প্রশ্নের উত্তরের আকার সবচেয়ে বড় হয় বলে নিরীক্ষকেরা অনেক সময় নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর পরখ করে দেখেন। এই ধরণের প্রশ্নের ধরণও একটু ভিন্নধরণের হয়। অনেক সময় প্রশ্নে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে বলা হয়। আবার অনেক সময় প্রশ্নে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে যৌক্তিকতা বর্ণনা করতে বলা হতে পারে। অনেকসময় দেখা যায়, প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। তখন মূলত যে সুন্দর করে উপযুক্ত যুক্তি দিয়ে নিজের মতামতটি ব্যাখ্যা করতে পারবে, তার উত্তরই বেশি হৃষ্ট পুষ্ট হবে।

        উচ্চতর দক্ষতার জন্য তোমার যে খুব বেশি পরিমাণের উচ্চতর দক্ষতা প্রয়োজন তা কিন্তু নয়, শুধুমাত্র লেখার সময় কয়েকটি ছোট কৌশল অবলম্বন করাই যথেষ্ট। এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য ৪ নম্বর বরাদ্দ থাকবে। সুতরাং প্রশ্নের উত্তরও ৪ প্যারায় লিখতে হবে। প্রথম তিন প্যারা লেখার ক্ষেত্রে প্রয়োগমূলক স্তরের পন্থা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ প্রথম তিন প্যারা লেখার সময় প্রয়োগমূলক স্তরের মত করেই লেখা যেতে পারে। চতুর্থ প্যারা লেখার সময় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। কেননা এই প্যারার উপকরণগুলোই উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্নকে প্রয়োগ থেকে আলাদা করে দিবে।

সময়- ৮/৯ মিনিট

গণিতে সৃজনশীল

যতক্ষণ অন্যান্য বিষয়গুলোতে সৃজনশীল পদ্ধতির কথা বলা হয়, সবার কাছেই সেটা অনেকটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যাপারটা গণিতে গিয়ে ঠেকে গেলেই শুরু হয় নানা ভয়ভীতিকর চিন্তাভাবনার। এটা সত্যি যে গণিতের সৃজনশীল অন্যান্য সৃজনশীল প্রশ্নের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। তবে গণিতে সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর করার সময় খেয়াল রাখতে হবে-

  • গণিতে উদ্দীপক খুব জরুরী তথ্যবহুল হয়। তাই শুরুতেই উদ্দীপকের খুঁটিনাটি খুঁজে বের করতে হবে।
  • গণিতের সৃজনশীলে প্রশ্নের একাংশের সাথে অন্য অংশের উত্তরের যোগসূত্র থাকে। তাই কখনোই প্রশ্নের কোনো অংশ বাদ দিয়ে পরের অংশে যাওয়া উচিত নয়, এক্ষেত্রে তথ্য সংকট ঘটতে পারে।
  • উদ্দীপকে অনেক সময় প্রশ্নের আকারে বিভিন্ন সূত্রের অংশ দেয়া থাকতে পারে।
  • হুবহু বইয়ের অংক সাধারণত গণিতের সৃজনশীলে দেয়া হয় না। কিন্তু বইয়ের বিভিন্ন কনসেপ্ট থেকেই কিন্তু প্রশ্ন করা হয়। তাই প্রশ্নের বিভিন্ন ধরণ সম্পর্কে “ক্লিয়ার কনসেপ্ট” থাকা বাঞ্ছনীয়।

সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে যে মিথ প্রচলিত আছে যে “সৃজনশীলে বেশি নম্বর উঠানো অনেক কঠিন,” তাদের জন্য বলতে চাই- নম্বর পাওয়া যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তবে সত্যিই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি অনেক কঠিন মনে হবে। তবে নিজের ভেতরের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সময়ের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে যদি প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা উপস্থিত থাকে, তবেই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি হয়ে উঠবে তোমার জন্য ছেলেখেলা।

শুভকামনা রইলো।

তথ্য সংগ্রহ:

http://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDFfMjBfMTNfM181MV8xXzEyNjI1

https://www.teachers.gov.bd/content/সৃজনশীল-প্রশ্নের-উত্তর-লেখার-নিয়মসমূহ

পাসপোর্ট নিয়ে যে সকল তথ্য তোমার জানা থাকা জরুরি

কয়েকটি ভিন্ন পরিবেশে এবং ভিন্ন পরিস্থিতির মাধ্যমে তিনটি গল্প উপস্থাপন করি।

১. সাইফুদ্দিন নিজের ও তার পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমাচ্ছে কাজের জন্য। গন্তব্য দুবাই। বাংলাদেশের সরকার থেকে দুবাই যাওয়ার ভিসা সে আগেই নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো দুবাই নেমে। সাইফুদ্দিন দুবাই কেনো এসেছে, এখানে সে কোথায় থাকবে, কতদিন থাকবে এরকম নানা প্রশ্ন করা শুরু হলো তাকে। নিরাপত্তার খাতিরে সব প্রশ্নের উত্তরই তাকে দিতে হলো। না হলে যে সে আর এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে পারবে না।

২. তেমন কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই “ওয়েলকাম টু মালয়শিয়া” বলে সামনের জনের পাসপোর্টটি এগিয়ে দিলো রিসিপশন থেকে। কিন্তু তারেক যখন গেলো তখন তাকে হতে হলো নানা প্রশ্নের সম্মুখীন। যদিও সে আগের জনের মতোই ছুটি কাটাতে এখানে এসেছে, কিন্তু তার ব্যাপারে কেনো যেনো বাড়তি সতর্কতা। কোন হোটেলে উঠবে, কতোদিন থাকবে, কোথায় কোথায় যাবে বলে ঠিক করেছে এসব কিছুর উত্তর তার দিতে হচ্ছে।

৩. ভ্রমণের জন্য মালদ্বীপ যাচ্ছে সিয়াম। ইমিগ্রেশনে যাওয়ার আগে সে অন অ্যারাইভাল ভিসার জন্য আবেদন করলো এবং প্রায় সাথে সাথেই ভিসা পেয়ে গেলো। প্রায় কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই সে ৩০ দিনের জন্য মালদ্বীপ ভ্রমণের ভিসা পেয়ে গেলো।

তিনটি গল্পের পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এই ঘটনাগুলোর পিছনে যা কাজ করছে, তা হলো ভ্রমণকারীদের পরিচয় বাহক। অর্থাৎ তাদের পাসপোর্ট। বিদেশে থাকার সময় অন্যদের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো পাসপোর্ট। একই পাসপোর্ট দিয়ে তুমি দুই জায়গায় দুই রকম আচরণ পেতে পারো। আবার একই পাসপোর্ট ব্যবহার করে একই জায়গায় দুইজন ব্যক্তি দুই রকম আচরণ পেতে পারে। এখানে চলে আসে পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং এবং এর বাহকের পরিচয়ের ব্যাপারটি।

একটু ভেঙে বলি। শুরুতে পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং নিয়ে বলা যাক। পাসপোর্টের এই র‍্যাঙ্কিং দিয়ে মূলত পরোক্ষভাবে বাহকের নাগরিকত্ব মূল্যায়ন করা হয়। এর মাধ্যমে জানা যায় বাহকের দেশের প্রতি অন্য দেশগুলোর মূল্যায়ন বা দৃষ্টিভঙ্গি কেমন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিকত্ব ও পরিকল্পনা বিষয়ক সংস্থা হেনলি অ্যান্ড পাসপোর্ট পার্টনার্স এই র‍্যাঙ্কিংটি তৈরি করে থাকে। র‍্যাঙ্কিংটি করা হয় মূলত ভিসা পলিসির উপর নির্ভর করে।

প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে হেনলি অ্যান্ড পাসপোর্ট পার্টনার্স বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে থাকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (IATA) এর কাছ থেকে। তাদের থেকে পাওয়া তথ্যের পাশাপাশি ১৯৯টি ভিন্ন পাসপোর্ট এবং ২২৭টি ভ্রমণযোগ্য স্থানের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হয়। বিশ্বাসযোগ্য সকল মাধ্যমের থেকে তথ্য নিরীক্ষণের পরে এই পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং করা হয়। এই র‍্যাঙ্কিং তৈরি করতে তাদের প্রায় পুরো বছর সময় লেগে যায়।

এখন কথা হলো র‍্যাঙ্কিংটি কীভাবে করা হয়? কোনো একটি দেশে বা অঞ্চলে ভ্রমণের জন্য যদি পাসপোর্টের বাহকের কোনো ভিসা দরকার না হয় অথবা যদি অন অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা পায়, তাহলে সেই পাসপোর্ট পায় ১ পয়েন্ট। আর যদি কোনো দেশে ভ্রমণের জন্য ভিসার দরকার হয়, তাহলে পায় ০ পয়েন্ট। এভাবে সব ভ্রমণ অঞ্চল মিলিয়ে যেই পাসপোর্টের ভিসা ফ্রি স্কোর (VFS) যতো বেশি, তার র‍্যাঙ্কিংও ততো উপরের দিকে। আর এভাবেই তৈরি হয় পাসপোর্ট পাওয়ার র‍্যাঙ্ক।

২০১৯ সালের পাসপোর্ট পাওয়ার র‍্যাঙ্ক-এ বাংলাদেশের VFS বা ভিসা ফ্রি স্কোর হলো ৪১। অর্থাৎ ২০১৯ সালে এসে বাংলাদেশকে ৪১টি দেশ ভিসামুক্ত ভ্রমণ অথবা অন অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা দিচ্ছে। এই স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পাওয়ার র‍্যাঙ্কিং এর বর্তমান অবস্থান হলো ৯৭। সময়ের সাথে সাথে সংখ্যাটি পরিবর্তিত হয়। দুটি দেশের মাঝে কূটনীতিক সম্পর্ক কেমন তার উপর নির্ভর করে দেশ দু’টি তাদের নাগরিকদের ভিসা মুক্ত ভ্রমণের সুবিধা দিবে কি দিবে না।

পাসপোর্ট র‍্যাঙ্কিং এর জন্য আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা হয় এবং তা হলো পাসপোর্টের গুণগত মান। কোনো একটি পাসপোর্টের মান যতো ভালো হবে, তা নকল করা ততো কঠিন। সেই সাথে ঐ পাসপোর্টের দামও জড়িত। পাসপোর্টের দাম ও মান থেকে বোঝা যায় সেই দেশের আর্থিক অবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা কীরকম। বাংলাদেশের পাসপোর্ট প্রিন্টিং এর কাজ করে “Polish Security Printing Works”।

খরচের কথা বিবেচনা করলে তা পাসপোর্ট ডেলিভারি সময়ের উপর নির্ভর করে। সাধারণ আবেদনে পাসপোর্ট পেতে ২১ দিন সময় লাগে এবং ভ্যাট সহ এর খরচ পরে ৩,৪৫০ টাকা। জরুরি ভিত্তিতে আবেদন করলে পাসপোর্ট ফিস দিতে হয় ভ্যাট সহ ৬,৯০০ টাকা, যা ৭ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। পাসপোর্ট রি-ইস্যু করার বেলাতেও একই পরিমাণ খরচ ও সময়ের হিসাব করা হয়। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট রি-ইস্যু করার বেলায় মেয়াদ পরবর্তী প্রতি বছরের জন্য ৩৪৫ টাকা করে সাধারণ ফিস দিতে হয়।

পাসপোর্ট ফিস জমা দিতে হয় সোনালি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের যে কোনো একটিতে। আর আবেদন করার জন্য অঞ্চলভিত্তিক আলাদা আলাদা পাসপোর্ট অফিসও আছে। বাংলাদেশ সরকারের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট www.dip.gov.bd  ভিজিট করলেই এর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবে।